লোড হচ্ছে...
ঢাকা: দীর্ঘ প্রায় এক মাস ধরে চলমান তীব্র গ্যাস সংকটে দেশের জনজীবন ও শিল্প উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বাসাবাড়ি ও যানবাহনে গ্যাসের সংকটের পাশাপাশ...
ঢাকা: দীর্ঘ প্রায় এক মাস ধরে চলমান তীব্র গ্যাস সংকটে দেশের জনজীবন ও শিল্প উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বাসাবাড়ি ও যানবাহনে গ্যাসের সংকটের পাশাপাশি গ্যাসের অভাবে শত শত শিল্পকারখানার উৎপাদন কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এতে রপ্তানি বাণিজ্য ও সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
হঠাৎ করে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির অবনতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করে সংকটের কারণ খতিয়ে দেখতে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিশেষ করে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড, সরাসরি ক্রয় নীতির আওতায় এলএনজি কার্গো সংগ্রহ এবং সময়মতো কার্গো সরবরাহ না হওয়ার বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যর্থতার দায় জ্বালানি বিভাগের ওপরও পড়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রধানমন্ত্রীর টেলিযোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদকে এলএনজি ক্রয়সহ জ্বালানি বিভাগের কার্যক্রম নিয়মিত অবহিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রেহান আসিফ আসাদ বুধবার বলেন, পুরো বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করতে আরও কয়েক দিন সময় প্রয়োজন।
এক্সিলারেটের টার্মিনালে আগুন, তদন্তে অসহযোগিতার অভিযোগ
গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির এলএনজি টার্মিনালের বয়লারে আগুন লাগার পর দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়। অগ্নিকাণ্ডের কারণে টার্মিনালটি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব ফজলুল হকের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সদস্যরা জুলাইয়ের শেষ দিকে মাতারবাড়িতে গিয়ে তদন্তের চেষ্টা করলেও টার্মিনালে প্রবেশের অনুমতি না পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
কমিটির এক সদস্যের দাবি, টার্মিনালে কর্মরত ৪০ জনের বাইরে নতুন কাউকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে না বলে এক্সিলারেট কর্তৃপক্ষ জানায়। একইভাবে সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রীও টার্মিনাল পরিদর্শনের অনুমতি পাননি বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে তিনি সেখানে না গিয়ে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানকে পাঠান।
এ বিষয়ে এক্সিলারেট এনার্জির পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
এলএনজি কার্গোর ঘাটতিতে আবারও বন্ধ টার্মিনাল
অগ্নিকাণ্ডের পর আংশিকভাবে ৬ আগস্ট এক্সিলারেটের টার্মিনালটি চালু হলেও পর্যাপ্ত এলএনজি কার্গো না থাকায় সরবরাহ পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।
বর্তমানে দেশের দুটি এলএনজি টার্মিনালের মধ্যে সামিটের টার্মিনাল থেকে দৈনিক প্রায় ৫৬ থেকে ৫৭ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। অন্যদিকে, এলএনজি কার্গোর অভাবে এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে।
আগামী ২৩ আগস্ট বিপি সিঙ্গাপুর থেকে একটি এলএনজি কার্গো আসার কথা রয়েছে। সেটি সময়মতো এলে এক্সিলারেটের টার্মিনাল পুনরায় চালু হওয়ার পাশাপাশি গ্যাস সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
সরাসরি ক্রয় করা এলএনজি কার্গো না আসায় সংকট
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, সরাসরি ক্রয় নীতির আওতায় কেনা একটি এলএনজি কার্গো নির্ধারিত সময়ে সামিটের টার্মিনালে পৌঁছায়নি। পরে স্পট মার্কেট থেকে অন্য একটি কার্গো কিনে সামিটের টার্মিনালে আনা হয়।
অন্যদিকে, এক্সিলারেটের টার্মিনাল গত এক সপ্তাহ ধরে এলএনজি সরবরাহের জন্য প্রস্তুত থাকলেও সেখানে সংযুক্ত করার মতো পর্যাপ্ত কার্গো পাওয়া যায়নি।
জ্বালানি বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তার দাবি, সরাসরি ক্রয় নীতির আওতায় কেনা কার্গোগুলো সময়মতো না আসার আশঙ্কা থাকলেও বিকল্প হিসেবে স্পট মার্কেট থেকে প্রয়োজনীয় কার্গো কেনার সিদ্ধান্ত যথাসময়ে নেওয়া হয়নি। এ কারণে সংকট আরও দীর্ঘায়িত হয়েছে।
শিল্প উৎপাদন ও বিদ্যুৎ সরবরাহে প্রভাব
দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকটে দেশের শিল্প খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গ্যাসের অভাবে শত শত কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এতে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক ও কর্মচারীর কর্মসংস্থান অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। বুধবার বিকাল ৫টায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৫০৪ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ করা হয়েছে ১৩ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট।
একই সময়ে সারা দেশে গ্যাস সরবরাহ ২২০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে যায়।
সংকটের দায় নির্ধারণে তদন্ত
গ্যাস সংকটের পেছনে জ্বালানি বিভাগের দায়িত্বে অবহেলা, পরিকল্পনার ঘাটতি এবং এলএনজি সংগ্রহে সমন্বয়হীনতার অভিযোগও উঠেছে। পুরো পরিস্থিতি এখন সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নজরদারিতে রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী নিজেই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং নিয়মিত গ্যাস সরবরাহ ও এলএনজি ক্রয়সংক্রান্ত তথ্য জানতে চাইছেন। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে বুধবার অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে সরাসরি ক্রয় নীতির আওতায় সাতটি কোম্পানির কাছ থেকে ১৪টি এলএনজি কার্গো কেনার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে সংকটের প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে গ্যাস সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট মহল আশা করছে।
Google AdSense Space
গুগল অ্যাডসেন্স অনুমোদনের পর এখানে বিজ্ঞাপন প্রদর্শিত হবে